Home

হুমায়ুন আজাদের (২৫) বিখ্যাত উক্তি এবং কবিতা [?]

হুমায়ুন আজাদ’ বাংলাদেশের অন্যতম সেরা স্পষ্টবাদী, সমালোচক, যুক্তিবাদী লেখক ও চিন্তাবিদ।

হুমায়ুন আজাদ ২০০৪ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ওই বছরের ৮ আগস্ট যান জার্মানির মিউনিখে। সেখানে ১১ আগস্ট মারা যান এই ভাষাবিজ্ঞানী।

 

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০ টির বেশী। ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩টি উপন্যাস, ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৮টি কিশোরসাহিত্য, ৭টি ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে নারীবাদী গবেষণামূলক গ্রন্থ নারী প্রকাশ করে গোটা দেশে সাড়া তুলেন। বইটি ১৯৯৫ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলো। এ গ্রন্থ তাঁর বহুল আলোচিত গবেষণামূলক কাজ হিসেবে স্বীকৃত।
হুমায়ুন আজাদ ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম এবং ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্যে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। তার রচিত কিশোরসাহিত্য ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আব্বুকে মনে পড়ে জাপানি ভাষায় অনুদিত হয়েছে ২০০৩।

হুমায়ুন আজাদের স্পষ্টবাদিতা এবং সোজা-সাপটা বক্তব্যগুলো নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই! প্রথাবিরোধী , দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষটি সোজাসাপ্টা সব ব্যঙ্গ করেছেন বাঙালি জীবনের যাবতীয় অসঙ্গতি নিয়ে, বারবার দিয়েছেন মৌলবাদের দাঁতভাঙা জবাব।

 

 

হুমায়ুন আজাদ এর বিখ্যাত কিছু উক্তি –

 

১. মহামতি সলোমনের নাকি তিন শো পত্নী, আর সাত হাজার উপপত্নী ছিলো। আমার মাত্র একটি পত্নী। তবু সলোমনের চরিত্র সম্পর্কে কারো কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আমার চরিত্র নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।

২. বাঙালি প্রতিবেশীর ঘরবাড়ির উপর বিনিদ্র চোখ রাখে, ওই বাড়িতে কে বা কারা আসে, কখন আসে ও যায়, সব সংবাদ রাখে, এবং সংবাদ বানায়। বাঙালির ঘরবাড়িতে যে দরজাজানালা লাগানোর ব্যবস্থা আছে, এটা আপত্তিকর ব্যাপার প্রতিবেশীর চোখে।

৩. মানুষ সিংহের প্রশংসা করে, কিন্তু আসলে গাধাকেই পছন্দ করে।

৪. ক্ষমতায় যাওয়ার একটিই উপায়; সমস্যা সৃষ্টি করা। সমস্যা সমাধান ক’রে কেউ ক্ষমতায় যায় না, যায় সৃষ্টি করে।

৫. একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার; কিন্তু একবার মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়।

৬. অনেক আগেই গভীর দুঃখে আমি আমার দেশের নাম দিয়েছিলাম ‘বাঙলাস্তান’; বছরে বছরে এটি অধিকতর ‘বাঙলাস্তান’ হয়ে উঠছে; দেশটি তিন দশক ধ’রে এতো নষ্টভ্রষ্টদুষ্টদের হাতে প’ড়ে গেছে যে এর কোনো মুক্তি নেই। এখানে ভালো আমরা খুবই কম দেখেছি, ওই স্বাধীনতাটুকু ছাড়া কি আর ভালো দেখেছি? এখানে কোনো জ্ঞান নেই, জ্ঞানের বিরুদ্ধে এখন চলছে সমস্ত কর্মকাণ্ড, সৃষ্টিশীলতা নেই, বিজ্ঞান নেই, শিল্পকলা নেই, এমনকি মানুষের জন্যে জীবনধারণের ব্যবস্থা নেই।
(আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম )

 

৭.শিক্ষকের জীবনের থেকে চোর, চোরাচালানি, দারোগার জীবন অনেক আকর্ষণীয়। এ সমাজ শিক্ষক চায় না, চোর- চোরাচালানি-দারোগা চায়।

৮. পা, বাংলাদেশে, মাথার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদোন্নতির জন্যে এখানে সবাই ব্যগ্র, কিন্তু মাথার যে অবনতি ঘটছে, তাতে কারো কোনো উদ্বেগ নেই।

৯. একজন চাষি বা নদীর মাঝি সাংস্কৃতিক-ভাবে যতোটা মূল্যবান, সারা সচিবালয় ও মন্ত্রীপরিষদও ততোটা মূল্যবান নয়।

১০. মানুষ কতোটা মিথ্যা বলতে ও বিশ্বাস করতে পারে, তার অসামান্য উদাহরণ জেসাস বা খ্রিষ্ট । জেসাস মানুষের শ্রেষ্ঠ কল্প-চরিত্র : গত দু-শো বছরের বাইবেল-বিজ্ঞানীরা, যাদের অনেকেই ধাৰ্মিক ও পুরোহিত, প্রমাণ করেছেন যে জেসাস নামে কেউ ছিলো না। কিন্তু জেসাস সৃষ্টি হলো কীভাবে, এবং হয়ে উঠলো একটি প্রধান ধর্মের প্রবর্তক? জেসাসকে সৃষ্টি করা, তাকে ঘিরে পুরাণ, ও একটি নতুন ধর্ম বানানোর সমস্ত কৃতিত্ব খ্রিষ্টান সুসমাচারপ্রণেতাদের। ক্ৰাইষ্ট এক কিংবদন্তি বা পুরাণ। জেসাস-সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ব্রুনো বাউআর, জে এম রবার্টসন, ভ্যান ডেন বার্গ ভ্যান এইসিংগা, আলবার্ট কালথোফ, গাই ফাউ, প্রোসপার আলফারিক, ডব্লিউ বি স্মিথ, জি এ ওয়েলস্ প্রমুখ তৈরি করেছেন একটি তত্ত্ব, যার নাম খ্রিস্টপুরান।

১১. মসজিদ ভাঙে ধার্মিকেরা, মন্দিরও ভাঙে ধার্মিকেরা, তারপরও তারা দাবি করে তারা ধার্মিক, আর যারা ভাঙাভাঙিতে নেই তারা অধার্মিক বা নাস্তিক। মসজিদ ও মন্দির ভাঙার সময় একটি সত্য দীপ্ত হয়ে ওঠে যে আল্লা ও ভগবান কতো নিষ্ক্রিয়, কতো অনুপস্থিত।

১২. গান্ধি দাবি করেন যে তিনি একই সাথে হিন্দু, খ্রিষ্টান, মুসলমান, বৌদ্ধ, ইহুদি, কনফুসীয় ইত্যাদি। একে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা মহৎ ব্যাপার ব’লে মনে করেছেন। কিন্তু এটা প্রতারণা, ও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ব্যাপার,- তিনি নিজেকে ক’রে তুলেছেন সব ধরনের খারাপের সমষ্টি। এমন প্রতারণা থেকেই উৎপত্তি হয়েছে বাবরি মসজিদ উপাখ্যানের। তিনি যদি বলতেন আমি হিন্দু নই, খ্রিস্টান নই, মুসলমান নই, বৌদ্ধ নই, ইহুদি নই, কনফুসীয় নই; আমি মানুষ, তাহলে বাবরি মসজিদ উপখ্যানের সম্ভাবনা অনেক কমতো।

১৩. ধনীরা যে মানুষ হয় না, তার কারণ ওরা কখনো নিজের অন্তরে যায় না। দুঃখ পেলে ওরা ব্যাংকক যায়, আনন্দেওরা আমেরিকা যায়। কখনো ওরা নিজের অন্তরে যেতে পারে না, কেননা অন্তরে কোনো বিমান যায় না।

১৪. উচ্চপদে না বসলে এদেশে কেউ মূল্য পায় না। সক্রেটিস এদেশে জন্ম নিলে তাঁকে কোনো একাডেমীর মহাপরিচালক পদের জন্যে তদ্বির চালাতে হতো।

১৫. সব ধরনের অভিনয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে রাজনীতি; রাজনৈতিকেরা অভিনয় করে সবচেয়ে বড় মঞ্চে ও পর্দায়।

১৬. কাঁপছেন কেনো? সন্ন্যাসী বলেন—আমার ভেতর শয়তান জেগে উঠেছে, তাই কাঁপছি আমি।

তরুণী জানতে চায়-কোথায় শয়তান, সন্ন্যাসী?

সন্ন্যাসী তরুণীকে দেখিয়ে দেয় উত্তেজিত পাপিষ্ঠ শয়তানকে।

তরুণী জানতে চায়—প্ৰভু, আমি কি করতে পারি, আমাকে বলুন।

সন্ন্যাসী বলেন , শয়তানকে নরকে পুরতে হবে, তাহলেই শান্তি পাবো আমি, সুখী হবেন ক্রাইস্ট।

তরুণী বলে, নরক কোথায় পাবো, সন্ন্যাসী? সন্ন্যাসী তরুণীকে দেখিয়ে দেয় যে নরক রয়েছে তার নাভিমূলের নিচে।

তরুণী বলে—তাহলে আপনি শয়তানকে নরকে পুরুন। সন্ন্যাসী ও তরুণী কয়েক দিন ধ’রে দিনরাত শয়তানকে নরকে পুরে শাস্তি দিতে থাকে, দাউদাউ জ্বলতে থাকে নরক, পুড়তে থাকে শয়তান। অবিরাম নরকে জ্ব’লে নিস্তেজ হয়ে প’ড়ে শয়তান, সে আর যন্ত্রণা দিতে পারে না; কিন্তু তরুণী আবেদন জানাতে থাকে—সন্ন্যাসী, শয়তানকে নরকে পুরুন, আমার নরক জ্বলছে। আর না পেরে গুহা ছেড়ে পালাতে থাকেন তরুণ সন্ত; তার পেছনে পেছনে দৌড়োতে থাকে তরুণী, এবং চিৎকার করতে থাকে—হে সন্ন্যাসী, আপনার শয়তান তো শাস্তি পেয়ে শান্ত হয়েছে, কিন্তু আমার নরক যে জ্বলছে।

ওই তরুণ হয়তো পরে হয়ে উঠেছিলেন কাম-বিদ্বেষী কোনো সন্ত; কোনো সন্ত পল, বা কোনো সন্ত টমাস। ( আমার অবিশ্বাস )

 

১৭. সত্য একবার বলতে হয়; সত্য বারবার বললে মিথ্যার মতো শোনায়। মিথ্যা বারবার বলতে হয়; মিথ্যা বারবার বললে সত্য ব’লে মনে হয়।

১৮. একটি আমলা আর একটা মন্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কাটানোর পর জীবনের প্রতি ঘেন্না ধরে গেলো, তারপর একটি চড়ুইয়ের সঙ্গে দু-মুহূর্ত কাটিয়ে জীবনকে আবার ভালবাসলাম।

১৯. অনেকে আমাদের সুবিধাবাদী রাজনৈতিকদের পতিতাদের সাথে তুলনা করেন। আমি এটাকে খুবই আপত্তিকর ও পতিতাদের জন্যে অপমানজনক বলে মনে করি। পতিতারা কোনো সুবিধা নেয়ার জন্যে দেহদান করে না, বেঁচে থাকার জন্যে দেহদান করে; আর আমাদের রাজনীতিবিদেরা সর্বস্ব দান করে সুবিধার জন্যে। তারা চরিত্রহীন, পতিতারা চরিত্রহীন নয়। (আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম)

২০. আধুনিক প্রচার মাধ্যমগুলো অসংখ্য শুয়োরবৎসকে মহা-মানবরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২১. বাক-স্বাধীনতার মূলকথা হচ্ছে, আপনি যা শুনতে চান না, আমার তা বলার অধিকার।

২২. টাকাই অধিকাংশ মানুষের একমাত্র ইন্দ্রিয়।

২৩. অধিকাংশ সুদর্শন পুরুষই আসলে সুদর্শন গর্দভ; তাদের সাথে সহবাসে একটি দুষ্প্রাপ্য প্রাণীর সাথে সহবাসের অভিজ্ঞতা হয়।

২৪. পুরুষ নারীকে সাজিয়েছে অসংখ্য কুৎসিত অভিধায়; তাকে বন্দি করার জন্য তৈরি করেছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র; উদ্ভাবন করেছে ঈশ্বর, নিয়ে এসেছে প্রেরিত পুরুষ।

২৫. ক্ষুধা ও সৌন্দর্য-বোধের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে-সব দেশে অধিকাংশ মানুষ অনাহারী, সেখানে মাংসল হওয়া রূপসীর লক্ষণ; যে-সব দেশে প্রচুর খাদ্য আছে, সেখানে মেদহীন হওয়া রূপসীর লক্ষণ।

 

 

আরো পড়ুন  প্রিয় হুমাইয়ুন আজাদ  c l i c k 

 

 

মানুষ ও কবিতা অবিচ্ছেদ্য। মানুষ থাকলে বুঝতে হবে কবিতা আছে, কবিতা থাকলে বুঝতে হবে মানুষ আছে। হুমায়ুন আজাদ-

হুমায়ুন আজাদ এর বিখ্যত কিছু কবিতা –

 

* ভালো থেকো কবিতা – হুমায়ুন আজাদ-

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
-ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।
-ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা। ভালো থেকো।

ভালো থেকো চর, ছোট কুড়ে ঘর, ভালো থেকো।
-ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির।
-ভালো থেকো জল, নদীটির তীর।

ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো।

-ভালো থেকো কাক, কুহুকের ডাক, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাশিঁ।
-ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি।
ভালো থেকো আম, ছায়া ঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।

-ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।
ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল,
-ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল,
ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাও,ভালো থেকো।

-ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।
ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।

 

* সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে -হুমায়ুন আজাদ-

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ পবিত্র প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার চাঁদ
নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ
শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।
রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবিশংকরের
সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙুর
ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল
কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।
চলে যাবে সেই সব উপকথাঃ সৌন্দর্য-প্রতিভা-মেধা;
এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা
নির্বাধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে
অত্যন্ত উল্লাসভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে।

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
সবচে সুন্দর মেয়ে দুইহাতে টেনে সারারাত
চুষবে নষ্টের লিঙ্গ; লম্পটের অশ্লীল উরুতে
গাঁথা থাকবে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী। চ’লে যাবে,
কিশোরীরা চ’লে যাবে, আমাদের তীব্র প্রেমিকারা
ওষ্ঠ আর আলিঙ্গন ঘৃণা ক’রে চ’লে যাবে, নষ্টদের
উপপত্নী হবে। এই সব গ্রন্থ শ্লোক মুদ্রাযন্ত্র
শিশির বেহালা ধান রাজনীতি দোয়েলের স্বর
গদ্য পদ্য আমার সমস্ত ছাত্রী মার্ক্স-লেনিন,
আর বাঙলার বনের মত আমার শ্যামল কন্যা-
রাহুগ্রস্থ সভ্যতার অবশিষ্ট সামান্য আলোক
আমি জানি তারা সব নষ্টদের অধিকারে যাবে।

 

 

* তৃতীয় বিশ্বের একজন চাষীর প্রশ্ন –হুমায়ুন আজাদ-

আগাছা ছাড়াই, আল বাঁধি, জমি চষি, মই দিই,
বীজ বুনি, নিড়োই, দিনের পর
দিন চোখ ফেলে রাখি শুকনো আকাশের দিকে। ঘাম ঢালি
খেত ভ’রে, আসলে রক্ত ঢেলে দিই
নোনা পানিরূপে; অবশেষে মেঘ ও মাটির দয়া হলে
খেত জুড়ে জাগে প্রফুল্ল সবুজ কম্পন।
খরা, বৃষ্টি, ঝড়, ও একশো একটা উপদ্রব কেটে গেলে
প্রকৃতির কৃপা হ’লে এক সময়
মুখ দেখতে পাই থোকাথোকা সোনালি শস্যের।
এতো ঘামে, নিজেকে ধানের মতোই
সিদ্ধ করে, ফলাই সামান্য, যেনো একমুঠো, গরিব শস্য।
মূর্খ মানুষ, দূরে আছি, জানতে ইচ্ছে করে
দিনরাত লেফ-রাইট লেফ-রাইট করলে ক-মণ শস্য ফলে
এক গন্ডা জমিতে?

 

 

* আমি সম্ভবত খুব ছোট কিছুর জন্য – হুমায়ুন আজাদ-

আমি সম্ভবত খুব বড় কিছুর জন্য মারা যাবো।
একটা বটবৃক্ষের জন্যে, কিংবা নায়াগ্রার জলপ্রপাতের জন্যে।
আমি হয়তো মারা যাবো বৈশাখী ঝড়ে
উড়ে যাওয়া অসংখ্য গাঙচিলের জন্যে, অঝোর বৃষ্টির জন্যে।

আমি সম্ভবত খুব বড় কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব কাছ থেকে শোনা, সিংহের গর্জনের জন্যে
বৃদ্ধের গালের অগুনিত রেখার জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো চোখের বালিতে
প্রাণবন্ত মৃদু এক হাসির জন্যে
কাঠফাটা রৌদ্রের জন্যে।
আমি সম্ভবত খুব বড় কিছুর জন্যে মারা যাবো
ঘোর অমাবস্যার জন্যে
বিদ্যুৎ গর্জিত মেঘের জন্যে

আমি হয়তো মারা যাবো পৈত্রিক মাটির ভিটায়
অবুঝ শিশুর ডানা ভাঙা একটি প্রজাপতির জন্যে
আস্ত একটা সবুজ জঙ্গলের জন্যে।
আমি সম্ভবত খুব বড় কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব বড় কিছু স্বপ্নের জন্যে
খুব অসাধারণ সুখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো সকলের চোখের সামনে
একটি প্রাণ জুড়ানো বড় দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
আকাশসম সৌন্দর্যের জন্যে।

 

হুমায়ুন   আজাদ এর প্রেমের কবিতা –

 

* সেই কবে থেকে – হুমায়ুন আজাদ –

সেই কবে থেকে জ্বলছি
জ্ব’লে জ্ব’লে নিভে গেছি ব’লে
তুমি দেখতে পাও নি ।
সেই কবে থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতিস্তম্ভের মতো ভেঙে পড়েছি ব’লে
তুমি লক্ষ্য করো নি ।
সেই কবে থেকে ডাকছি
ডাকতে ডাকতে স্বরতন্ত্রি ছিঁড়ে বোবা হয়ে গেছি ব’লে
তুমি শুনতে পাও নি ‘।
সেই কবে থেকে ফুটে আছি
ফুটে ফুটে শাখা থেকে ঝ’রে গেছি ব’লে
তুমি কখনো তোলো নি ।
সেই কবে থেকে তাকিয়ে রয়েছি
তাকিয়ে তাকিয়ে অন্ধ হয়ে গেছি ব’লে
একবারো তোমাকে দেখি নি ।

 

* আমাকে ভালোবাসার পর (অংশবিশেষ) –হুমায়ুন আজাদ-

 

আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।
রাস্তায় নেমেই দেখবে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রতিটি রিকশায়
ছুটে আসছি আমি আর তোমাকে পেরিয়ে চ’লে যাচ্ছি
এদিকে-সেদিকে। তখন তোমার রক্ত আর কালো চশমায় এত অন্ধকার
যেনো তুমি ওই চোখে কোন কিছুই দ্যাখো নি।
আমাকে ভালবাসার পর তুমি ভুলে যাবে বাস্তব আর অবাস্তব,
বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য। সিঁড়ি ভেবে পা রাখবে স্বপ্নের চূড়োতে,
ঘাস ভেবে দু-পা ছড়িয়ে বসবে অবাস্তবে,
লাল টুকটুকে ফুল ভেবে খোঁপায় গুঁজবে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন।
না-খোলা শাওয়ারের নিচে বারোই ডিসেম্বর থেকে তুমি অনন্তকাল দাঁড়িয়ে
থাকবে এই ভেবে যে তোমার চুলে ত্বকে ওষ্ঠে গ্রীবায় অজস্র ধারায়
ঝরছে বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল।
তোমার যে ঠোঁটে চুমো খেয়েছিলো উদ্যমপরায়ণ এক প্রাক্তন প্রেমিক,
আমাকে ভালবাসার পর সেই নষ্ট ঠোঁট খঁসে প’ড়ে
সেখানে ফুটবে এক অনিন্দ্য গোলাপ।

 

* তোমার দিকে আসছি – হুমায়ুন আজাদ –

 

অজস্র জন্ম ধরে আমি তোমার দিকে আসছি,
কিন্তু পৌঁছুতে পারছি না।
তোমার দিকে আসতে আসতে আমার এক একটা দীর্ঘ জীবন ক্ষয় হয়ে যায়,
পাঁচ পঁয়সার মোম বাতির মত।
আমার প্রথম জন্মটা কেটে গিয়েছিলো শুধু তোমার স্বপ্ন দেখে দেখে,
এক জন্ম আমি শুধু তোমার স্বপ্ন দেখেছি।
আমার দুঃখ,
তোমার স্বপ্ন দেখার জন্যে আমি মাত্র একটি জন্ম পেয়েছিলাম।
আরেক জন্মে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পরেছিলাম তোমার উদ্দেশ্য।
পথে বেরিয়েই আমি পলি মাটির উপর আকাঁ দেখি তোমার পায়ের দাগ,
তার প্রতিটি রেখা আমাকে পাগল করে তোলে।
ঐ আলতার দাগ,আমার চোখ,আর বুক আর স্বপ্নকে এতো লাল করে তুলে,
যে আমি তোমাকে সম্পূর্ন ভুলে যাই,
ঐ রঙ্গীন পায়ের দাগ প্রদক্ষীন করতে করতে আমার ঐ জন্মটা কেটে যায়।
আমার দুঃখ !
মাত্র একটি জন্ম আমি পেয়েছিলাম সুন্দর কে প্রদক্ষীন করার।
আরেক জন্মে তোমার কথা ভাবতেই-
আমার বুকের ভিতর থেকে সবচে দীর্ঘ আর কোমল,আর ঠাণ্ডা নদীর মত
কি যেন প্রবাহিত হতে শুরু করে।
সেই দীর্ঘশ্বাসে তুমি কেঁপে উঠতে পারো ভেবে আমি একটা মর্মান্তিক দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে কাটিয়ে দেই সম্পুর্ন জন্মটা।

আমার দুঃখ, আমার কোমলতম দীর্ঘশ্বাসটি ছিল মাত্র এক জন্মের সমান দীর্ঘ,
আমার ষোঁড়শ জন্মে একটি গোলাপ আমার পথ রোধ করে,
আমি গোলাপের সিঁড়ি বেয়ে তোমার দিকে উঠতে থাকি-
উঁচুতে ! উঁচুতে !! আরো উঁচুতে !!!
আর এক সময় ঝড়ে যাই চৈত্রের বাতাসে।
আমার দু:খ
মাত্র একটি জন্ম আমি গোলাপের পাপঁড়ি হয়ে তোমার উদ্দেশ্য ছড়িয়ে পরতে পেরেছিলাম।
এখন আমার সমস্ত পথ জুড়ে টলমল করছে একটি অশ্রু বিন্দু।
ঐ অশ্রু বিন্দু পেরিয়ে এ জন্মে হয়তো আমি তোমার কাছে পৌঁছুতে পারবনা;
তাহলে ,আগামী জন্ম গুলো আমি কার দিকে আসবো ?

 

 

হুমায়ুন আজাদ কিভাবে মারা যায় ?

বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে ২০০৪ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি  রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ওই বছরের ৮ আগস্ট যান জার্মানির মিউনিখে। সেখানে ১১ আগস্ট মারা যান এই ভাষাবিজ্ঞানী।

 

হুমায়ুন আজাদ কাব্যসমগ্র –

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০ টির বেশী। ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩টি উপন্যাস, ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৮টি কিশোরসাহিত্য, ৭টি ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ।

 

 

 

Related Articles

how do you feel about this website ?

Back to top button
%d bloggers like this: